বাংলাদেশ ও কুয়েতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার লক্ষ্যে কুয়েত চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (কেসিসিআই) এবং বাংলাদেশের একটি উচ্চ পর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার কুয়েত সিটির চেম্বারের আল বুম হলে এই আনুষ্ঠানিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
এই বৈঠকটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে কারণ এটি ২০১৬ সালে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) ও কেসিসিআই-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘প্রটোকল অব কোঅপারেশন’-এর পর দুই পক্ষের মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক আলোচনা। দীর্ঘ বিরতির পর এই আলোচনা দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এফবিসিসিআই এবং অন্যান্য বাণিজ্য সংগঠনের প্রতিনিধিরা ছাড়াও তৈরি পোশাক, ওষুধ শিল্প, কৃষিপণ্য এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের কোম্পানির প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। অন্যদিকে, কেসিসিআই-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং কুয়েতের ব্যবসায়ীরাও আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি, নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ অনুসন্ধান এবং একটি টেকসই অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা। আলোচনার শুরুতে কেসিসিআই-এর সহকারী মহাপরিচালক ফিরাত এম. আল-ওদা বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের উষ্ণ স্বাগত জানান এবং উভয় দেশের মধ্যে ব্যবসায়িক সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কেসিসিআই-এর পূর্ণ সহায়তার আশ্বাস দেন।
কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল সৈয়দ তারেক হোসেন এই বৈঠককে দুই দেশের জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, "এটি শুধু ২০১৬ সালের প্রটোকলের ধারাবাহিকতা নয়, বরং দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের নতুন অধ্যায়।"
রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, বিশাল তরুণ ও কর্মঠ জনসংখ্যা এবং নির্দিষ্ট কিছু খাতে দেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বিশেষভাবে পোশাক, ওষুধ শিল্প, তথ্য-প্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের সম্ভাবনাগুলোর উপর আলোকপাত করেন। তিনি কুয়েতি বিনিয়োগকারীদের এসব উদীয়মান খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে পারস্পরিক সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য আন্তরিক আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের প্রধান ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রপ্তানি) মো. আবদুর রহিম খান দেশের বর্তমান বাণিজ্য পরিবেশ এবং নীতি সংস্কারের অগ্রগতির বিষয়ে বিস্তারিত জানান। তিনি বাংলাদেশের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, দক্ষ জনশক্তি এবং জনসংখ্যার সুবিধা তুলে ধরেন। তিনি আরও জানান যে, সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু করেছে, যা বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকে সহজ করেছে। তিনি কুয়েতি ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে এসে সরাসরি বিনিয়োগের সুযোগ যাচাই করার জন্য আমন্ত্রণ জানান।
বৈঠকে বাংলাদেশের শিল্প প্রতিনিধিরা নিজ নিজ খাতের সম্ভাবনা বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেন এবং সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ প্রস্তাব দেন। বিশেষ করে, স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিদ্যমান সুবিধাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শনের জন্য কুয়েতি ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
কুয়েতি প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের এসব প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেন। তাঁরা বাংলাদেশ থেকে আমদানি বাড়ানো এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে আউটসোর্সিং সহযোগিতার প্রতি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাঁরা জানান, বাংলাদেশে একটি প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে বিনিয়োগের বাস্তব সম্ভাবনা যাচাই করার জন্য তাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।
এই ঐতিহাসিক বৈঠকটি পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ইতিবাচক বার্তা দিয়ে শেষ হয়। উভয় পক্ষই বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এবং আগামী দিনগুলোতে আরও কার্যকরভাবে কাজ করার বিষয়ে দৃঢ়ভাবে একমত হন।
© 2025 NRB. All Rights Reserved.