বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রবাসী শ্রমনির্ভর দেশ। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইতালি, যুক্তরাজ্য, জাপানসহ বিশ্বের প্রায় ১৬৫টি দেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মরত। তাদের কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত অর্থই আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে, গ্রামীণ জীবনে স্বচ্ছলতা আনছে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করছে।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এখনও অনেক প্রবাসী ভাই-বোন অবৈধ বা অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠান, যেমন—হুন্ডি বা ব্যক্তিগত এজেন্টের মাধ্যমে। এতে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং দেশেরও বড় ধরনের ক্ষতি হয়। তাই বৈধ বা লিগ্যাল চ্যানেল ব্যবহার করে অর্থ প্রেরণ এখন সময়ের দাবি।
“রেমিট্যান্স” বলতে বোঝায়, প্রবাসে কর্মরত কোনো ব্যক্তি তার উপার্জিত অর্থ নিজের দেশে প্রেরণ করা। এটি শুধু পরিবারের আর্থিক সহায়তার মাধ্যম নয়, বরং দেশের অর্থনীতিরও একটি বড় উৎস।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০২4 সালে প্রবাসীরা বৈধ পথে পাঠিয়েছেন প্রায় ২,২০০ কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স। এই অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ায়, টাকার মান স্থিতিশীল রাখে এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বৈধ চ্যানেল বলতে বোঝায় সরকার অনুমোদিত ও নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতির মাধ্যমে টাকা পাঠানো। এই চ্যানেলগুলো হলো —
ব্যাংকের মাধ্যমে প্রেরণ:
প্রবাসীরা বিদেশের যে কোনো অনুমোদিত ব্যাংকের মাধ্যমে তাদের পরিবারের নামে সরাসরি বাংলাদেশে টাকা পাঠাতে পারেন। প্রেরক ও গ্রাহক উভয়েই নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন।
মানি ট্রান্সফার কোম্পানি (MTC):
যেমন — Western Union, MoneyGram, Xpress Money, Ria, Transfast ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সংস্থা। এদের মাধ্যমে কয়েক মিনিটের মধ্যেই অর্থ বাংলাদেশে পৌঁছে যায়।
মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS):
বাংলাদেশে বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি মোবাইল ফাইন্যান্স সার্ভিসের মাধ্যমে এখন বৈধভাবে বিদেশ থেকে টাকা পাঠানো যায়। এটি দ্রুত, নিরাপদ ও সহজ।
এক্সচেঞ্জ হাউস ও ব্যাংক এজেন্ট:
বিদেশে বাংলাদেশি ব্যাংকের এজেন্ট বা এক্সচেঞ্জ হাউস থেকেও বৈধ পথে টাকা পাঠানো সম্ভব। উদাহরণ: Sonali Exchange, Janata Remittance, Islami Bank Exchange, Agrani Exchange ইত্যাদি।
অনেক সময় প্রবাসীরা হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিক এজেন্টের মাধ্যমে টাকা পাঠান কারণ এতে তারা মনে করেন সময় বাঁচে বা রেট বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু এর মাধ্যমে অনেক ঝুঁকি ও ক্ষতি হয়, যেমনঃ
প্রেরিত টাকা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রেরক বা গ্রাহক কেউই কোনো আইনি সুরক্ষা পান না।
হুন্ডির টাকা কালো বাজারে যায়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকার এই অর্থের কোনো হিসাব রাখতে পারে না।
দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে।
অতএব, স্বল্প লাভের আশায় অবৈধ পথে টাকা পাঠানো মানে নিজের দেশের প্রতি দায়িত্ব অবহেলা করা।
বৈধ পথে অর্থ পাঠালে প্রবাসী কর্মী ও তার পরিবার উভয়ের জন্য অনেক সুবিধা রয়েছে:
নিরাপত্তা: অর্থ প্রেরণের সব রেকর্ড থাকে, তাই কোনো ঝুঁকি নেই।
দ্রুততা: বর্তমান সময়ে অনলাইন ব্যাংকিং ও মোবাইল সার্ভিসের কারণে টাকা কয়েক মিনিটের মধ্যেই দেশে পৌঁছে যায়।
সরকারি প্রণোদনা (Incentive):
বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে বৈধ পথে পাঠানো অর্থের উপর ২.৫% প্রণোদনা দিচ্ছে। অর্থাৎ, ১ লাখ টাকা পাঠালে পরিবার পাবে ১,০২,৫০০ টাকা।
ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সুযোগ: বৈধ পথে প্রেরিত অর্থের ব্যাংক রেকর্ড থাকায় ভবিষ্যতে লোন, হাউজিং স্কিম, বিনিয়োগ বা সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা হয়।
দেশের উন্নয়নে অবদান: এই রেমিট্যান্স থেকেই দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা থাকে, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন সম্ভব হয়, এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
নিচে কিছু জনপ্রিয় ও নির্ভরযোগ্য উপায় উল্লেখ করা হলো যেগুলোর মাধ্যমে প্রবাসীরা নিরাপদে টাকা পাঠাতে পারেনঃ
Islami Bank Bangladesh Ltd – IBBL Remittance Service
Sonali Exchange Company (UK, USA, UAE)
Western Union / MoneyGram / Ria Money Transfer
DBBL Nexus & Rocket Remittance
bKash International Remittance (in partnership with Western Union, Tranglo, etc.)
Agrani Exchange House (Singapore, Malaysia, Canada)
এগুলোর মাধ্যমে টাকা পাঠাতে শুধু প্রেরকের আইডি, গ্রাহকের নাম ও মোবাইল নম্বর যথেষ্ট।
বাংলাদেশ সরকার প্রবাসীদের জন্য বিভিন্ন সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যেমন:
বৈধ পথে পাঠালে প্রণোদনা ঘোষণা (২.৫%)
বিদেশে অবস্থিত এক্সচেঞ্জ হাউসের সংখ্যা বৃদ্ধি
অনলাইন অ্যাপসের মাধ্যমে নিরাপদ রেমিট্যান্স সার্ভিস
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক – যারা প্রবাসীদের আর্থিক সেবা, ঋণ ও বিনিয়োগে সহায়তা করে।
এছাড়া, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় নিয়মিতভাবে হুন্ডির বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছে।
সর্বদা ব্যাংক বা অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে অর্থ পাঠান।
হুন্ডি ব্যবসায়ী বা ব্যক্তিগত এজেন্টদের বিশ্বাস করবেন না।
পরিবারের সদস্যদেরকেও বৈধ পথে টাকা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করুন।
ব্যাংক একাউন্ট খুলে রাখুন, যাতে সরাসরি অর্থ গ্রহণ করা যায়।
নিজের দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখুন, কারণ প্রবাসীদের অর্থই দেশের শক্তি।
রেমিট্যান্স শুধু অর্থের প্রবাহ নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির মেরুদণ্ড। একজন প্রবাসীর বৈধ পথে পাঠানো প্রতিটি টাকা বাংলাদেশের উন্নয়নে অবদান রাখে। হুন্ডির মতো অবৈধ পথ ব্যবহার করলে আপনি শুধু নিজের নয়, দেশেরও ক্ষতি করছেন।
তাই প্রতিটি প্রবাসী ভাই-বোনের উচিত — বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ করা, সরকারের প্রণোদনার সুবিধা গ্রহণ করা এবং দেশের উন্নয়নের অংশীদার হওয়া।
© 2025 NRB. All Rights Reserved.