Visa Services
দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও করণীয়

দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম উন্নত ও শক্তিশালী অর্থনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। দেশটি কেবল প্রযুক্তি ও শিল্প খাতেই নয়, অভিবাসী শ্রমিকদের জন্যও একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে পরিচিত। উন্নত কর্মপরিবেশ, উচ্চ বেতন, নিরাপদ কর্মস্থল এবং সামাজিক সুবিধার কারণে দক্ষিণ কোরিয়া অনেক দেশের শ্রমিকদের কাছে স্বপ্নের দেশ। বাংলাদেশের জন্যও এই বাজারটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।

২০০৮ সালে বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর জন্য ‘এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেম’ (ইপিএস) চালু হয়। এই ব্যবস্থার আওতায় দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে বাংলাদেশসহ মোট ১৬টি দেশ থেকে কর্মী নিয়োগ দিয়ে থাকে। তবে, দীর্ঘ ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ এখনো এই সুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। প্রতি বছর নির্দিষ্টসংখ্যক কোটা বরাদ্দ পেলেও, বাস্তবে সেই পরিমাণ শ্রমিক পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এটি দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


কোটা পূরণে ব্যর্থতার কারণ

২০২৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশকে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ কর্মীর কোটা দিয়েছে, কিন্তু পাঠানো সম্ভব হয়েছে মাত্র কয়েক হাজার। এর পেছনে কয়েকটি মূল কারণ রয়েছে—

প্রথমত, ভাষাগত দক্ষতার অভাব। দক্ষিণ কোরিয়ায় কাজ করতে হলে কর্মীদের কোরিয়ান ভাষায় দক্ষ হতে হয়। এজন্য কোরিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্ট (KLPT) উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক। কোরিয়ান নিয়োগকর্তারা এমন শ্রমিককেই অগ্রাধিকার দেন, যারা ভাষায় দক্ষ এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারে। নেপাল, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার কর্মীরা এই ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকায় তাদের চাহিদা তুলনামূলক বেশি। বাংলাদেশের অনেক প্রার্থী ভাষায় দুর্বল থাকায় পরীক্ষায় সফল হলেও নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েন।

দ্বিতীয়ত, কারিগরি দক্ষতার ঘাটতি। কোরিয়ার কোম্পানিগুলো এমন কর্মী চায় যারা নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা রাখে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ সুবিধা সীমিত এবং অনেক কর্মী পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ পান না। ফলে নিয়োগকর্তাদের প্রত্যাশা পূরণে তারা ব্যর্থ হন।

তৃতীয়ত, প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা। বোয়েসেল ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর প্রক্রিয়া প্রায়ই দীর্ঘ সময় নেয়। ভাষা ও দক্ষতা পরীক্ষায় পাশ করার পরও চূড়ান্ত নিয়োগ হতে মাসের পর মাস লেগে যায়। এতে অনেক প্রার্থী ভিসা প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় থেকে হতাশ হয়ে অন্য সুযোগের দিকে চলে যান।


অন্যান্য দেশের সাফল্যের কারণ

দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারে নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া প্রায় পুরো কোটা পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছে। তাদের সফলতার পেছনে কয়েকটি কারণ স্পষ্ট—

১. সরকারি সমন্বয় ও দ্রুত পদক্ষেপ: এসব দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো সরাসরি কোরিয়ান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সহজ ও স্বচ্ছ রাখে।
২. ভাষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ: কর্মীদের ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণে বড় আকারের সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ রয়েছে।
৩. কর্মী প্রস্তুতির মানদণ্ড: কর্মীদের নিয়োগের আগে তারা বাস্তব প্রশিক্ষণ এবং কর্মপরিবেশের সঙ্গে পরিচিতি লাভের সুযোগ পায়, যা তাদের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

বাংলাদেশে এই ধরনের সমন্বিত প্রচেষ্টা এখনো তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে আমাদের কর্মীরা কোটা পেলেও নিয়োগের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।


বাংলাদেশের করণীয়

দক্ষিণ কোরিয়ার মতো সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হলে বাংলাদেশকে এখনই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে—

১. ভাষা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ জোরদার করা:
দেশব্যাপী উন্নত মানের কোরিয়ান ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন। সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ভাষা কোর্স চালু করতে পারে। পাশাপাশি দক্ষতা প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোতে কোরিয়ান মানদণ্ড অনুযায়ী কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।

২. প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজীকরণ:
বোয়েসেলসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রম ডিজিটালাইজড করতে হবে। ভিসা প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে অনলাইন আবেদন, স্বচ্ছ যাচাই এবং সরাসরি কোরিয়ান কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা উচিত।

৩. কোরিয়ার চাহিদা অনুযায়ী কর্মী প্রস্তুত করা:
কোরিয়ার শ্রমবাজারের প্রবণতা নিয়মিত বিশ্লেষণ করে কোন খাতে বেশি চাহিদা—যেমন নির্মাণ, কৃষি, উৎপাদন বা মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং—সে অনুযায়ী বিশেষ প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরি করা যেতে পারে।

৪. দক্ষ কর্মীদের ডাটাবেস তৈরি:
দক্ষতা, ভাষা ও পেশাগত প্রোফাইল অনুযায়ী কর্মীদের একটি জাতীয় ডাটাবেস তৈরি করলে কোরিয়ান নিয়োগকর্তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মী নির্বাচন সহজ হবে।

৫. কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা:
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে শ্রম বিষয়ক যৌথ কমিটি সক্রিয় করে কোটার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে ইতিবাচক সমঝোতা গড়ে তোলা দরকার।

দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের জন্য একটি উচ্চ রেমিট্যান্স অর্জনের সম্ভাবনাময় গন্তব্য। বর্তমানে যেখানে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর, সেখানে কোরিয়ার মতো উন্নত অর্থনীতিতে দক্ষ কর্মী পাঠানো দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে বৈচিত্র্য আনতে পারে।

এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধু কোটা বরাদ্দের ওপর নির্ভর না করে, ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রশাসনিক বাধা দূর করা জরুরি। দক্ষ ও প্রস্তুত কর্মী তৈরি করা গেলে, বাংলাদেশ শুধু কোরিয়াতেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য উচ্চবেতনের শ্রমবাজারেও তার অবস্থান আরও মজবুত করতে পারবে

3 months ago Admin 37
Trending Topics
Visa Rejection Reasons and Solutions
Ad Banner

News by Category

© 2025 NRB. All Rights Reserved.