বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, এবং অন্যান্য দেশে কর্মরত প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি শ্রমিক প্রতি বছর দেশের অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণ করে চলেছেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশই বিদেশে নানা রকম শোষণ, অধিকার বঞ্চনা ও নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হন।
এই প্রবন্ধে আমরা বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকার, সেগুলো রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় আইন, এবং বাংলাদেশ ও প্রবাস দেশের সহায়তা ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) অনুযায়ী, প্রতিটি শ্রমিকের কিছু মৌলিক অধিকার রয়েছে, যা দেশ, ধর্ম, জাতি নির্বিশেষে সবার জন্য প্রযোজ্য। সেগুলো হলো —
ন্যায্য মজুরি ও সময়মতো বেতন প্রদান
নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ
নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও সাপ্তাহিক ছুটি
অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত না হওয়া
পাসপোর্ট ও ব্যক্তিগত নথির অধিকার সংরক্ষণ
অবকাশ, চিকিৎসা ও দুর্ঘটনা বীমা সুবিধা
সম্মানজনক আচরণ ও বৈষম্যহীনতা
বাংলাদেশের অধিকাংশ শ্রমিক কর্মরত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে — যেমন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন ইত্যাদি। প্রতিটি দেশের নিজস্ব শ্রম আইন রয়েছে, যা বিদেশি শ্রমিকদের জন্য কিছু মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে।
চুক্তি অনুযায়ী বেতন ও কাজের সময়: শ্রমিকদের বেতন সময়মতো দিতে হবে এবং প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা কাজ নির্ধারিত।
Iqama (রেসিডেন্স পারমিট): নিয়োগকর্তার দায়িত্ব হলো সময়মতো ইকামা নবায়ন করা।
বাসস্থান ও চিকিৎসা: কোম্পানিকে বিনামূল্যে বাসস্থান ও প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হয়।
পাসপোর্ট আটকানো আইনত দণ্ডনীয়: সৌদি শ্রম আইনে পাসপোর্ট নিয়োগকর্তার কাছে রেখে দেওয়া অপরাধ।
বিরোধ মীমাংসা বোর্ড: যদি শ্রমিক বেতন বা কাজের পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ করে, তবে শ্রম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ ও সমাধানের ব্যবস্থা রয়েছে।
কর্মচুক্তি লিখিত ও সরকারি নিবন্ধনকৃত হতে হবে।
বেতন সুরক্ষা ব্যবস্থা (Wage Protection System): এর মাধ্যমে শ্রমিকদের বেতন সরাসরি ব্যাংকে জমা হয়, ফলে বেতন আটকে রাখার সুযোগ থাকে না।
বীমা ও স্বাস্থ্য সুবিধা: কোম্পানিকে সকল কর্মীর জন্য স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চিত করতে হয়।
নিরাপত্তা ও অভিযোগের সুযোগ: শ্রমিকরা প্রয়োজনে শ্রম আদালতে অভিযোগ করতে পারেন।
বাংলাদেশ সরকার বিদেশে কর্মরত নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য বহু কার্যক্রম চালাচ্ছে। নিচে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সহায়তা উল্লেখ করা হলো:
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (MoEWOE):
প্রবাসীদের সুরক্ষা, পুনর্বাসন, প্রশিক্ষণ ও অভিযোগ নিষ্পত্তির দায়িত্ব পালন করে।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক:
বিদেশে যাত্রার আগে ঋণ সহায়তা এবং প্রবাসীদের রেমিট্যান্স গ্রহণে সহায়তা করে।
ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার বোর্ড:
বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের আইনি সহায়তা ও আর্থিক অনুদান প্রদান করে।
বাংলাদেশ দূতাবাস / শ্রম উইং:
প্রতিটি দেশেই বাংলাদেশের দূতাবাসে “Labour Welfare Wing” থাকে, যারা শ্রমিকদের অভিযোগ শুনে আইনি সহায়তা, পাসপোর্ট নবায়ন, মৃত্যুর পর মরদেহ ফেরত আনা ইত্যাদি বিষয়ে সাহায্য করে।
Expatriates’ Welfare Desk (বিমানবন্দরে):
প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের তথ্য সংগ্রহ, সহায়তা ও সমস্যার সমাধান করার জন্য বিমানবন্দরে বিশেষ ডেস্ক রয়েছে।
যদিও আইন ও নীতিমালা বিদ্যমান, বাস্তবে অনেক শ্রমিক নানা সমস্যার মুখোমুখি হন:
চুক্তি অনুযায়ী বেতন না পাওয়া
অতিরিক্ত কাজের চাপ ও বিশ্রামের অভাব
পাসপোর্ট জব্দ করে রাখা
মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন
কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়া বা বেতন বন্ধ
আইনি সহায়তা পাওয়ার জটিলতা
অনেক সময় ভাষাগত অজ্ঞানতা, আইনি অজ্ঞতা এবং ভয়ভীতির কারণে প্রবাসীরা তাদের অধিকার দাবি করতে পারেন না।
১️. চুক্তি ভালোভাবে পড়ে সই করা:
দেশ ছাড়ার আগে নিজের চাকরির চুক্তিপত্র (Employment Contract) অবশ্যই পড়ে বুঝে সই করতে হবে।
২️. পাসপোর্ট নিজের কাছে রাখুন:
নিয়োগকর্তাকে পাসপোর্ট দিতে বাধ্য নন। এটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি।
৩️. দূতাবাসের যোগাযোগ তথ্য রাখুন:
যে দেশে যাচ্ছেন, সেখানে বাংলাদেশের দূতাবাস ও শ্রম উইং-এর ঠিকানা ও ফোন নম্বর নোট করে রাখুন।
৪️. সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে জানানো:
যদি বেতন না পান, নির্যাতনের শিকার হন, বা কোনো সমস্যা হয়, তবে স্থানীয় শ্রম অফিস বা দূতাবাসে অভিযোগ দিন।
৫️. নিরাপদ চ্যানেলে অর্থ প্রেরণ করুন:
বৈধ চ্যানেল ব্যবহার করলে সরকারী প্রণোদনাও পাবেন এবং ভবিষ্যতে আইনি সহায়তা নেওয়া সহজ হবে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) বাংলাদেশের শ্রমিকদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করতে বিদেশি সরকারগুলোর সঙ্গে কাজ করছে। এর মাধ্যমে —
শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ
সচেতনতা বৃদ্ধি
মানব পাচার প্রতিরোধ
ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতকরণ
ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। সরকার নারী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে —
বিদেশ যাত্রার আগে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ
হেল্পলাইন: ০৮০০০০৭৭৭৭৭ (টোল ফ্রি)
মহিলা কল্যাণ কর্মকর্তার মাধ্যমে আইনি সহায়তা
নির্যাতনের শিকার হলে দেশে ফেরার ব্যবস্থা
স্থানীয় শ্রম অফিস বা দূতাবাসে অভিযোগ দাখিল
তদন্ত ও মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া
প্রয়োজনে শ্রম আদালতে মামলা
ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন ব্যবস্থা
বাংলাদেশ সরকার ও বিদেশি কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে এই প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করে থাকে।
প্রবাসী শ্রমিকরা বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদস্পন্দন। তাদের ঘাম ও পরিশ্রমেই বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা এগিয়ে চলছে। তাই তাদের অধিকার রক্ষা করা শুধু সরকারের নয়, বরং সমাজেরও নৈতিক দায়িত্ব।
প্রত্যেক প্রবাসী শ্রমিকের উচিত নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা, কোনো অন্যায় সহ্য না করা এবং বৈধ পথে সহায়তা চাওয়া। একইভাবে, প্রতিটি নিয়োগকর্তা ও দেশকেও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রমিকদের সম্মান ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
শ্রমিকের অধিকার মানে মানবাধিকারেরই অংশ। তাই আসুন — আমরা সবাই একসঙ্গে “নিরাপদ, ন্যায্য ও মানবিক শ্রম পরিবেশ” নিশ্চিত করি, যাতে প্রবাসীরা শুধু অর্থ প্রেরক নয়, গর্বের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন।
© 2025 NRB. All Rights Reserved.